সব বিষয়ে ভালো ফলে জন্য দরকার প্রাথমিকের গণিতে শক্ত ভিত্তি

সব বিষয়ে ভালো ফলে জন্য দরকার প্রাথমিকের গণিতে শক্ত ভিত্তি

বাংলাদেশের প্রি-স্কুল বা কিন্ডারগার্টেনে অনেক শিশুই খেলা, গান ও গল্পের মাধ্যমে শেখে। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, গণিত শেখার বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায় না। অথচ, ছোটবেলা থেকেই শিশুদের চিন্তা-ভাবনায় গণিতের ধারণা তৈরি হয়।

শিশুরা যখন বস্তু হাতে নেয়, গুনে, তুলনা করে, আকৃতি তৈরি করে—তখনই তারা গণিত শেখে।
উদাহরণস্বরূপ:

  • খেলনা বা ফলমূল গুনে শেখা
  • কোন দলে কয়টি বেশি, কয়টি কম তা তুলনা করা
  • কাঠি বা বোতল দিয়ে মাপ নেওয়া
  • ব্লক দিয়ে ঘর, ত্রিভুজ, বর্গ তৈরি করা
  • খেলনার যোগ-বিয়োগ করা

এইসব কাজের মধ্য দিয়েই শিশুদের গণিতভিত্তি (math foundation) তৈরি হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে (প্রথম শ্রেণি) ভর্তি হয়, তখন তাদের গণিত জ্ঞান যত ভালো থাকে, ভবিষ্যতে সব বিষয়েই তারা তত ভালো ফল করে।

কিন্তু বাংলাদেশে এখনো অনেক প্রি-স্কুলে এই মৌলিক গণিত শেখার সুযোগ পায় না।
এটি পরিবর্তনের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:


চারটি মূল দিক

১. প্রারম্ভিক শিক্ষকদের গণিত শেখানোর প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি
বাংলাদেশে অনেক প্রি-স্কুল বা কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকই গণিত শেখাতে আত্মবিশ্বাসী নন। এর কারণ, তাদের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। তাছাড়া বেসরকারি পর্যায়ের শিক্ষক প্রশিক্ষণ কোর্সগুলোতে গণিত শেখানোর বিশেষ কোর্স নেই বা সীমিত।
তাই তাদের জন্য হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন—যেখানে শেখানো হবে কিভাবে শিশুদের খেলাধুলা ও দৈনন্দিন কাজে গণিত শেখানো যায়।

২. প্রি-স্কুলে গণিত শেখার সময় বৃদ্ধি
বর্তমানে অনেক কিন্ডারগার্টেনে দৈনন্দিন রুটিনে গণিতের সময় খুব কম রাখা হয়।
দিনে অন্তত ১৫-২০ মিনিট গণিত-ভিত্তিক খেলা ও কার্যক্রম রাখলে শিশুদের দক্ষতা বাড়ে।

৩. মানসম্মত পাঠ্যক্রম তৈরি
প্রি-স্কুলে ব্যবহৃত পাঠ্যক্রমে গণিতের উপস্থিতি বাড়ানো দরকার।
শিশুদের বয়স ও মানসিক বিকাশ অনুযায়ী গণিত শেখানোর জন্য বয়স উপযোগী কারিকুলাম তৈরি করতে হবে, যাতে তারা খেলার ছলে শেখে—শুধু মুখস্থ নয়, বুঝে।

৪. অভিভাবক-শিক্ষক অংশীদারিত্ব
অভিভাবকরা যদি জানেন কীভাবে ঘরে দৈনন্দিন কাজের মাধ্যমে গণিত শেখানো যায়, তবে শিশুরা আরও দ্রুত শেখে।
তাই অভিভাবকদেরও নিয়মিত পরামর্শ, নির্দেশনা এবং সহজ কার্যক্রম দেওয়া উচিত।


বাংলাদেশি শিশুদের জন্য উপযোগী কিছু গণিত কার্যক্রম

গণিত ধারণা উদাহরণ কার্যক্রম
গণনা ও সংখ্যা বোঝা শিশুকে দিয়ে ফল বা খেলনা গুনতে দিন (যেমন: “এই প্লেটে কয়টা আম আছে?”)।
তুলনা ও যোগফল বলুন, “তোমার কাছে ৩টা লাল বল, আমার কাছে ২টা—মোট কয়টা?”
মাপজোখ কাঠি বা স্কেল দিয়ে দুইটি পেন্সিলের দৈর্ঘ্য তুলনা করতে দিন।
আকৃতি ও স্থান চিন্তা শিশুকে দিয়ে ব্লক বা কাঠি দিয়ে ত্রিভুজ, বর্গ, ঘর বানাতে বলুন।

শিক্ষকেরা এসব কার্যক্রম ছোট ছোট দলে করাতে পারেন।
এছাড়া প্রতিদিনের ক্লাসের মধ্যেও গণিত ঢুকিয়ে দেওয়া যায়—
যেমন:

  • ক্লাসে কয়জন ছেলে, কয়জন মেয়ে—গুনে দেখা
  • কয়টা চেয়ার আছে
  • কয়টা বই বেশি বা কম

ঘরে গণিত শেখানো (অভিভাবকের ভূমিকা)

অভিভাবকরা ঘরেই সহজভাবে গণিত শেখাতে পারেন—

  • খাবারের সময় গুনে দিন: “তোমার প্লেটে ৫টা আঙ্গুর আছে”
  • জিজ্ঞাসা করুন: “আমার প্লেটে কয়টা? কারটা বেশি?”
  • যোগ-বিয়োগ খেলুন: “তুমি যদি ২টা খাও, কয়টা বাকি থাকবে?”

ঘরের কাজ যেমন খেলনা গোছানো, জামা গোনা, বাজারে জিনিস কেনা—সবকিছুতেই গণিত শেখার সুযোগ আছে।


কেন এটা গুরুত্বপূর্ণ

শুধু শিক্ষক প্রশিক্ষণ নয়—যখন শিক্ষক ও অভিভাবক একসাথে কাজ করেন, তখন শিশুর শেখা সবচেয়ে কার্যকর হয়।

তাই স্কুলের উচিত—

  • অভিভাবক সভায় গণিত শেখানোর সহজ কৌশল শেয়ার করা
  • শিশুদের শেখা বিষয়ে অভিভাবকদের ফিডব্যাক দেওয়া
  • ঘরে করবার মতো ছোট ছোট অ্যাকটিভিটি দেওয়া

উপসংহার

বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রাথমিক বয়সের গণিত শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যদি আমরা—

  • শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিই,
  • গণিত শেখানোর সময় বাড়াই,
  • মানসম্পন্ন পাঠ্যক্রম ব্যবহার করি,
  • পরিবারকে যুক্ত করি,

তাহলে শিশুরা শৈশবেই গণিতে শক্ত ভিত্তি তৈরি করবে—যা তাদের ভবিষ্যতের শিক্ষাজীবন ও জীবন দক্ষতার জন্য অপরিহার্য।


প্রস্তাবনা:
শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং বেসরকারি প্রি-স্কুল প্রতিষ্ঠানগুলো একযোগে কাজ করলে এই পরিবর্তন সম্ভব।
প্রতিটি প্রি-স্কুলে “Early Math Corner” বা “গণিতের খেলার ঘর” স্থাপন করা যেতে পারে—যেখানে শিশুরা খেলতে খেলতে শিখবে।

লেখক : মো. বাকী বিল্লাহ; শিশুশিক্ষা ও ব্যক্তিগত উন্নয়ন প্রশিক্ষক এবং উদ্যোক্তা। প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জিটিএফসি

Leave a Reply

Scroll to Top